একুরিয়াম বা শখের মাছ পোষা কেবল ঘর সাজানোর অংশ নয়, এটি একটি বড় দায়িত্ব। মাছের সঠিক যত্ন নিলে তারা যেমন সুস্থ থাকে, তেমনি আপনার একুরিয়ামটিও দীর্ঘস্থায়ী এবং সুন্দর থাকে। নতুন বা অভিজ্ঞ—সকলের জন্যই একুরিয়ামের মাছের সঠিক যত্ন নেওয়ার একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা নিচে দেওয়া হলো।
১. সঠিক একুরিয়াম এবং পরিবেশ তৈরি (Setting Up)
মাছ আনার আগেই তাদের ঘর অর্থাৎ একুরিয়ামটি প্রস্তুত করা সবচেয়ে জরুরি কাজ।
ট্যাংক সাইকেল করা (Cycling): নতুন একুরিয়ামে সঙ্গে সঙ্গে মাছ ছাড়া উচিত নয়। প্রথমে পানি, ফিল্টার এবং নুড়িপাথর দিয়ে একুরিয়ামটি অন্তত ১-২ সপ্তাহ চালু রাখতে হয়। এতে পানিতে উপকারি ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয় যা মাছের বর্জ্য (Ammonia) ভেঙে পানিকে নিরাপদ রাখে। একে 'নাইট্রোজেন সাইকেল' বলা হয়।
সঠিক আকার নির্বাচন: নতুনদের জন্য খুব ছোট একুরিয়াম (যেমন ফিশ বোল) কেনা উচিত নয়। অন্তত ১০-১৫ গ্যালন বা ২ ফুট লম্বা একুরিয়াম হলে পানির ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হয়।
স্থান নির্বাচন: একুরিয়াম এমন জায়গায় রাখুন যেখানে সরাসরি সূর্যের আলো পড়ে না। অতিরিক্ত সূর্যের আলোতে পানিতে শেওলা (Algae) জমে পানি সবুজ হয়ে যায়।
২. জল এর গুণমান রক্ষা (Water Quality Maintenance)
মাছ পানির জীব, তাই পানি ভালো থাকলে মাছও ভালো থাকবে।
পানির কন্ডিশনার ব্যবহার: কলের পানিতে বা সাপ্লাইয়ের পানিতে ক্লোরিন থাকে, যা মাছের জন্য বিষাক্ত। পানি দেওয়ার আগে অবশ্যই 'ওয়াটার কন্ডিশনার' (Water Conditioner) বা 'অ্যান্টি-ক্লোরিন' ব্যবহার করে ক্লোরিন মুক্ত করতে হবে।
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: মাছের প্রজাতির ওপর ভিত্তি করে পানির তাপমাত্রা ঠিক রাখতে হয়। গোল্ডফিশ ঠান্ডা পানিতে থাকতে পারলেও গাপ্পি, মলি বা অ্যাঞ্জেল ফিশের জন্য ২৪°C থেকে ২৭°C তাপমাত্রা প্রয়োজন। শীতকালে অবশ্যই ভালো মানের হিটার ব্যবহার করতে হবে।
ফিল্ট্রেশন: একটি ভালো মানের ফিল্টার একুরিয়ামের প্রাণ। এটি পানি পরিষ্কার রাখে এবং অক্সিজেন সরবরাহ করে। ফিল্টারটি ২৪ ঘণ্টাই চালু রাখা উচিত।
৩. মাছকে সঠিক খাবার দেওয়া (Feeding)
অধিকাংশ শৌখিন মাছ মারা যায় অতিরিক্ত খাবার দেওয়ার কারণে।
পরিমাণ: মাছকে ততটুকুই খাবার দিন যতটুকু তারা ২-৩ মিনিটের মধ্যে খেয়ে শেষ করতে পারে। অতিরিক্ত খাবার পচে গিয়ে পানিতে অ্যামোনিয়া তৈরি করে, যা মাছের জন্য মারাত্মক।
ফ্রিকোয়েন্সি: দিনে ১ বা ২ বার খাবার দেওয়াই যথেষ্ট।
খাবারের বৈচিত্র্য: সব সময় একই ধরনের খাবার না দিয়ে মাঝে মাঝে খাবারের পরিবর্তন আনুন। প্যাকেটজাত দানাদার খাবারের পাশাপাশি ফ্রোজেন ফুড বা জীবন্ত খাবার (যেমন টিউবিফেক্স ওয়ার্ম - তবে এটি জীবাণুমুক্ত হতে হবে) দেওয়া যেতে পারে।
৪. নিয়মিত পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ (Cleaning & Maintenance)
একুরিয়াম পরিষ্কার রাখা মানে পুরো পানি ফেলে দেওয়া নয়।
আংশিক পানি পরিবর্তন (Partial Water Change): সপ্তাহে বা ১০ দিনে একবার একুরিয়ামের ২০-৩০% পানি পরিবর্তন করুন। কখনোই সব পানি একসাথে পরিবর্তন করবেন না, এতে উপকারি ব্যাকটেরিয়া মারা যায় এবং মাছ শক (Shock) খেয়ে মারা যেতে পারে।
সাইফন পাইপ ব্যবহার: পানি পরিবর্তনের সময় সাইফন পাইপ (Gravel Vacuum) ব্যবহার করে তলার নুড়িপাথরের ভেতর জমে থাকা বর্জ্য পরিষ্কার করুন।
গ্লাস পরিষ্কার: একুরিয়ামের কাঁচে শেওলা জমলে স্পঞ্জ বা ম্যাগনেটিক ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করুন।
সাবান ব্যবহার নিষিদ্ধ: একুরিয়ামের ভেতরের কোনো কিছু পরিষ্কার করতে ভুলেও সাবান বা ডিটারজেন্ট ব্যবহার করবেন না। সামান্য সাবানও মাছের জন্য প্রাণঘাতী।
৫. মাছ নির্বাচন এবং সঙ্গী বাছাই (Choosing Fish & Tank Mates)
সব মাছ একসাথে রাখা যায় না।
আগ্রাসী বনাম শান্ত: কিছু মাছ খুব শান্ত (যেমন গোল্ডফিশ, গাপ্পি), আবার কিছু মাছ খুব আগ্রাসী (যেমন অস্কার, ফাইটার)। শান্ত মাছের সাথে রাক্ষুসে মাছ রাখলে তারা ছোট মাছদের খেয়ে ফেলবে বা কামড়ে মেরে ফেলবে।
জায়গা: একুরিয়ামের আকার অনুযায়ী মাছের সংখ্যা নির্ধারণ করুন। অতিরিক্ত মাছ রাখলে (Overcrowding) অক্সিজেনের অভাব হয় এবং রোগবালাই বেশি ছড়ায়।
৬. মাছের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ (Health Monitoring)
প্রতিদিন কয়েক মিনিট সময় নিয়ে মাছগুলো পর্যবেক্ষণ করুন। অসুস্থতার লক্ষণগুলো হলো:
মাছ খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া।
একুরিয়ামের কোণায় ঝিম মেরে বসে থাকা।
শরীরে সাদা সাদা দানা (White Spot Disease) বা ক্ষত দেখা দেওয়া।
পাখনা পচে যাওয়া বা ছিঁড়ে যাওয়া।
কোনো মাছ অসুস্থ হলে তাকে দ্রুত আলাদা পাত্রে (Hospital Tank) সরিয়ে চিকিৎসা দিন, যাতে অন্য মাছে রোগ না ছড়ায়।
৭. ডেকোরেশন এবং লুকানোর জায়গা
মাছেরও প্রাইভেসির প্রয়োজন হয়।
গাছপালা: জীবন্ত গাছ (Live Plants) একুরিয়ামের পরিবেশকে প্রাকৃতিক রাখে এবং পানি ফিল্টার করতে সাহায্য করে। যদি জীবন্ত গাছ রাখা কঠিন মনে হয়, তবে ভালো মানের সিল্কের কৃত্রিম গাছ ব্যবহার করতে পারেন।
লুকানোর স্থান: পাথর, গুহা বা কাঠের টুকরো (Driftwood) দিয়ে মাছের লুকানোর জায়গা তৈরি করুন।এতে মাছের স্ট্রেস বা ভয় কমে যায়।
অ্যাকুরিয়ামে মাছের ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানো এবং তাদের বড় করা একটি ধৈর্যসাপেক্ষ কিন্তু আনন্দদায়ক কাজ। সদ্যজাত মাছের বাচ্চা (Fry) খুব সংবেদনশীল হয়, তাই তাদের বিশেষ যত্নের প্রয়োজন।
নিচে ধাপে ধাপে যত্ন নেওয়ার পদ্ধতিগুলো আলোচনা করা হলো:
১. ডিম আলাদা করা (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ)
অধিকাংশ অ্যাকুরিয়াম ফিশ (যেমন- গোল্ডফিশ, জেব্রা ফিশ, টেট্রা ইত্যাদি) নিজেদের ডিম বা বাচ্চা নিজেরাই খেয়ে ফেলে। তাই ডিম পাড়ার সাথে সাথেই মা-বাবা মাছ থেকে ডিমগুলোকে আলাদা করা বাচ্চার বাঁচার হার অনেক বাড়িয়ে দেয়।
আলাদা ট্যাঙ্ক: ডিমগুলো একটি ছোট বা অগভীর ট্যাঙ্কে সরিয়ে নিন।
ব্রীডিং বক্স: যদি আলাদা ট্যাঙ্ক না থাকে, তবে মূল ট্যাঙ্কের ভেতরেই একটি জালের 'ব্রীডিং বক্স' বা 'নেট' ব্যবহার করতে পারেন।
২. জলের পরিবেশ ঠিক রাখা
বাচ্চাদের জন্য পরিষ্কার এবং স্থির জল খুব জরুরি।
ফিল্টার: শক্তিশালী পাওয়ার ফিল্টার ব্যবহার করবেন না, এতে বাচ্চারা শুষে যেতে পারে। এর পরিবর্তে স্পঞ্জ ফিল্টার (Sponge Filter) ব্যবহার করুন। এটি জল পরিষ্কার রাখে এবং মৃদু বুদবুদ তৈরি করে যা বাচ্চাদের ক্ষতি করে না।
তাপমাত্রা: জলের তাপমাত্রা কিছুটা উষ্ণ রাখার চেষ্টা করুন (সাধারণত ২৬-২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস অনেক মাছের জন্য আদর্শ)। প্রয়োজনে হিটার ব্যবহার করুন।
এয়ার পাম্প: খুব ধীর গতিতে এয়ার পাম্প বা অক্সিজেন চালু রাখুন যাতে জলে অক্সিজেনের অভাব না হয়।
৩. বাচ্চার খাবার (Feeding)
বাচ্চা ফোটার পর প্রথম ২-৩ দিন তাদের খাওয়ানোর প্রয়োজন হয় না। এই সময় তারা তাদের পেটের নিচে থাকা 'কুসুম থলি' (Yolk Sac) থেকে পুষ্টি পায়। যখন তারা সাঁতার কাটতে শুরু করবে (Free swimming), তখন তাদের খুব ক্ষুদ্র খাবার দিতে হবে:
ইনফিউসোরিয়া (Infusoria): এটি এক ধরণের আণুবীক্ষণিক জীব যা খালি চোখে দেখা যায় না। এটি সদ্যজাত বাচ্চার জন্য সেরা খাবার। পুরোনো অ্যাকুরিয়ামের জল বা শ্যাওলা যুক্ত জলে এটি প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়।
ডিমের কুসুম: একটি সেদ্ধ ডিমের কুসুমের খুব সামান্য অংশ (এক চিমটি) জলে গুলিয়ে ড্রপার দিয়ে এক ফোঁটা করে বাচ্চার ট্যাঙ্কে দিতে পারেন। সতর্কতা: এটি খুব সামান্য দেবেন, কারণ অতিরিক্ত ডিমের কুসুম জল খুব দ্রুত নষ্ট করে ফেলে।
বেবি ব্রাইন শ্রিম্প (Baby Brine Shrimp): বাচ্চা একটু বড় হলে (১ সপ্তাহ পর) জ্যান্ত ব্রাইন শ্রিম্প খাওয়ালে তারা খুব দ্রুত বাড়ে।
পাউডার খাবার: বাজারে বিশেষ 'ফ্রাই ফুড' (Fry food) পাওয়া যায়, অথবা সাধারণ মাছের খাবার মিহি গুঁড়ো করে দিতে পারেন।
৪. জল পরিবর্তন (Water Change)
বাচ্চাদের ট্যাঙ্কের জল খুব দ্রুত নোংরা হয়, বিশেষ করে খাবার দেওয়ার কারণে।
প্রতিদিন বা একদিন পর পর ১০-১৫% জল পরিবর্তন করুন।
জল পরিবর্তনের সময় খুব সরু পাইপ (যেমন স্যালাইনের পাইপ) ব্যবহার করুন যাতে বাচ্চারা পাইপ দিয়ে বেরিয়ে না যায়।
কিছু জরুরি টিপস:
আলো: দিনে ৮-১০ ঘণ্টা সাধারণ আলো দিন, কিন্তু রাতে অন্ধকার রাখুন যাতে তারা বিশ্রাম নিতে পারে।
ধৈর্য: সব ডিম ফুটে বাচ্চা নাও বের হতে পারে। কিছু ডিম সাদা হয়ে ফাঙ্গাস পড়ে যেতে পারে, সেগুলো ড্রপার দিয়ে সাবধানে সরিয়ে ফেলুন যাতে ভালো ডিমগুলো নষ্ট না হয়।
.jpg)
